হোম / তথ্য-প্রযুক্তি / গ্রামীণফোনের একক আধিপত্য থাকছে না
8cf05bc628f707ecab6129b28a37ec1bx600x400x28

গ্রামীণফোনের একক আধিপত্য থাকছে না

বাংলাদেশ রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার কেবল নেটওয়ার্কে গ্রামীণফোনের একক আধিপত্য থাকছে না। অন্য মোবাইল অপারেটররাও এ নেটওয়ার্ক লিজ নিতে পারবে।

তবে তা নিতে হবে ন্যাশনওয়াইড টেলিকম ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক (এনটিটিএন) লাইসেন্সের নিয়ম মেনেই। গ্রামীণফোন যেভাবে দীর্ঘ মেয়াদে লিজ নিয়ে এর কোর উন্নয়ন করে, সাব লিজ দিয়ে ব্যবহার করছে সেভাবে নয়। আর গ্রামীণফোনও অপটিক্যাল ফাইবার কেবল যেভাবে ব্যবহার করে আসছে তাতেও পরিবর্তন আসতে পারে।টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসির সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যে চুক্তির অধীনে গ্রামীণফোন রেলওয়ের ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে, সেটি সংশোধনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই কমিটিকে বিটিআরসির কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশের টেলিযোগাযোগ আইন তথা এনটিটিএন লাইসেন্সের নীতিমালা পাশ কাটিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে গত ১৩ নভেম্বর ডার্ক অপটিক্যাল ফাইবার কোর (ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক) উন্নয়ন এবং লিজ দেওয়ার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। ওই দরপত্রে রেলওয়ের স্থাপিত বিভিন্ন রাউটে ডার্ক অপটিক্যাল ফাইবার লিজ/ভাড়া দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। দরপত্রে অ্যাকসেস নেটওয়ার্ক সিস্টেম এএনএসসহ (মোবাইল অপারেটর) সব ধরনের

টেলিকম অপারেটরকে অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়। কিন্তু এনটিটিএন লাইসেন্সের নীতিমালা অনুযায়ী ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা এবং ব্যবসা একমাত্র বৈধ এনটিটিএন অপারেটর ছাড়া আর কারো করার সুযোগ নেই। যদি কেউ করে থাকে তা হবে বিদ্যমান টেলিযোগাযোগ আইনের পরিপন্থী।

বর্তমানে ট্রান্সমিশন সেবা দেওয়ার জন্য বিটিআরসি থেকে লাইসেন্স পাওয়া পাঁচটি এনটিটিএন প্রতিষ্ঠান হচ্ছে বিটিসিএল, বাংলাদেশ রেলওয়ে, পিজিসিবি, ফাইবার অ্যাট হোম এবং সামিট কমিউনিকেশনস।

গত ২ নভেম্বর ডাক ও টেলিযোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম রাষ্ট্রায়ত্ত কম্পানি বিটিসিএলের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ের ফাইবার অপটিক কেবল লিজ চেয়ে চিঠি দেন। পাশাপাশি সব এনটিটিএন অপারেটরের জন্য লিজ উন্মুক্ত করার কথা বলেন তিনি।

রেলমন্ত্রী মুজিবুল হকের কাছে দেওয়া তারানা হালিমের চিঠিতে বলা হয়, দেশব্যাপী বাংলাদেশ রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত ব্যাকহল সেবা বিস্তৃত করা সম্ভব। শুধু একটি মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হয়ে থাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামো ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে একদিকে যেমন টেলিযোগাযোগ খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে দেশব্যাপী বিস্তৃত এ নেটওয়ার্কের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হচ্ছে না। এতে জনগণ সেবা বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত রাজস্ব প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃক সাম্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রান্তিক টেলিযোগাযোগ সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যাকহল ট্রান্সমিশন সেবা দেওয়া হলে এবং অব্যবহূত ডার্ককোর অন্যান্য ট্রান্সমিশন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বিশেষত সরকারি মালিকানাধীন বিটিসিএলের কাছে লিজ দেওয়া হলে রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবারের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে বৈষম্যহীনভাবে রেলওয়ের অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্কের বাণিজ্যিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করার জন্য বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনার জন্যও প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম রেলপথমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।

চিঠিতে আরো বলা হয়, টেলিযোগাযোগ খাতে লাইসেন্সিং নীতিমালা অনুযায়ী শুধু ট্রান্সমিশন সেবা প্রদানের জন্য লাইসেন্সপ্রাপ্ত অপারেটররাই দেশব্যাপী ব্যাকহল ট্রান্সমিশন সেবা প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পৃথক আইন ও বিধিবিধানের আলোকে পরিচালিত হলেও টেলিযোগাযোগ লাইসেন্সধারী হিসেবে টেলিযোগাযোগসংক্রান্ত আইন ও বিধি অনুসরণ বাঞ্ছনীয়।

কিন্তু এ চিঠি পাওয়ার পরও রেলওয়ে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট নীতিমালার পরিপন্থীভাবে ওই দরপত্র আহ্বান করে। বিষয়টি বিটিআরসির নজরে এলে রেলওয়েকে এ নীতিমালা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।

এ অবস্থায় আগের দরপত্রে কোনো পরিবর্তন আনা হয়েছে কি না—জানতে চাইলে গতকাল রাতে রেলওয়ের চিফ সিগন্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন প্রকৌশলী নাসির উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রি বিড মিটিংয়ে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। গ্রামীণফোনের সঙ্গে চুক্তির সংশোধন সম্পর্কে তিনি বলেন, এ বিষয়ে কমিটি কাজ করছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে রেলওয়ের দুই হাজার ২০৯ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ফাইবার অপটিক কেবল রয়েছে। ১৯৮৬ সালে নরওয়ে সরকারের অনুদানে এক হাজার ৮০০ কিলোমিটার রেলওয়ের নিজস্ব ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ১৯৯২ সালে এ কাজ শেষ হয়। ১৯৯৭ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রামীণফোনের সঙ্গে রেলওয়ের একটি লিজ চুক্তি সই হয়। চুক্তি অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানটি রেলওয়ের ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ব্যবহার শুরু করে। এ সময় আরো ৪০৯ কিলোমিটার অপটিক ফাইবার কেবল নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়।

রেলওয়ের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গ্রামীণফোনের কাছ থেকে বাৎসরিক ভিত্তিতে নির্ধারিত ভাড়া ছাড়াও চুক্তি অনুযায়ী গ্রামীণফোন যেসব ক্ষেত্রে সাব লিজ দিচ্ছে সেখান থেকেও রেলওয়ে মোট মূল্যের ৩০ শতাংশ পাচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ রেলওয়ের ফাইবার অপটিক্যালভিত্তিক টেলিযোগাযোগ পূর্ণাঙ্গ রক্ষণাবেক্ষণও করছে গ্রামীণফোন।

রেলওয়ের ওই দরপত্র নিয়ে অন্য এনটিটিএন অপাটেরদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তারা গত ৩০ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিআরসির কাছে লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি এই খাতে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা বজায় রাখার জন্য অনুরোধ করেছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, সরকার যখন টেলিযোগাযোগ খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কাজ করছে, ঠিক সে সময় রেলওয়ের এ ধরনের দরপত্র আহ্বান করা এই খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ ‘ভিশন-২০২১’ বাস্তবায়নে ব্যাংক থেকে উচ্চহারে সুদের বিনিময়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক স্থাপনের কাজ করা হচ্ছে। আর তখনই একটি দরপত্রের মাধ্যমে নন-এনটিটিএন লাইসেন্সধারীদের ট্রান্সমিশনের ব্যবসা করার সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে, যা টেলিযোগাযোগ আইনের পরিপন্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *